চলো_হারাই_নতুন_ভোরে (০১)


 প্রেগন্যান্সির কিটে পরপর দুই টা রঙ্গিন রেখা দেখে নিঃশ্বাস থমকে যায় পাপড়ির। বুকের ভেতর উঠতে থাকে ঘৃ*ণার ঢেউ।লজ্জা ,বি*ষাদ , অনুশোচনায় গা গুলিয়ে বমি আসার উপক্রম‌ । পরাগ ইশতেহাম ইলাহী নামক পুরুষ টাকে খু*ন করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পাপের ভার শুধু পরাগের নয়। দুই মাস  আগে জ্বরের ঘোরে সে নিজেই পরাগ নামক অপ্রিয় পুরুষ’কে কাছে টেনে নিয়েছিল। অনিচ্ছাকৃত দুইটা বি*বস্ত্র দেহের সমন্বয় ঘটেছিল।সেই মি*লনের‌ই আজ প্রতিফলন একটি ভ্র'ণ।যা তার শরীরে ধীরে ধীরে বুনছে একটা প্রাণের গল্প।


পাপড়ি কী করবে বুঝে উঠতে পারে না।মাথার চুল খা*মচে ধরে নিচে বসে পড়ে। সেদিন রাতের পর এই ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল পাপড়ির। এক সপ্তাহ যাবৎ নিজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করে পাপড়ি।মনটা অস্থির,মাথা ঘুরে, কিছু খেলেই বমি হয়ে উঠে আসে। সবচেয়ে বড় কথা এ মাসে তার পি*রিয়ড মিসিং। পাপড়ি গুগলে সার্চ করে দেখে এসব  প্রেগন্যান্সির লক্ষণ।এটা দেখা মাত্রই তার শরীরে নেমে আসে নিঃশব্দ কাঁপন।চটজলদি প্রেগন্যান্সি টেস্ট করিয়ে নেয় সে।


গতকাল‌ই পরাগের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে সে। পরাগ নামক কালো অধ্যায় মুছে ফেলেছে স্মৃতির পাতা  থেকে।আর আজকেই সে জানতে পারল সেই অপ্রিয় পুরুষের সন্তানের মা হতে চলেছে সে।পাপড়ি নিজের পেটের উপর হাত রাখে।সে  খুব করে চেয়েছিল মা হতে।। কিন্তু অপ্রিয় পুরুষের অস্তিত্ব বহন করতে চায় নি।চেয়েছে তার ভালোবাসার পুরুষের অস্তিত্ব। পাপড়ি সন্তপর্ণে চোখের পানি মুছে নেয়।পেটে হাত বুলিয়ে বলে,


“আমি চাইলেও মাতৃত্ব অস্বীকার করতে পারবো না। তুই দুনিয়ার আলো দেখবি সো*না।নীরব  আমাকে জান দিয়ে ভালোবাসে।এই মাসেই তো বিয়ে হ‌ওয়ার কথা আমাদের। আমার বিশ্বাস নীরব  সবটা জানার পর আমাকে অস্বীকার করবে না। নীরবের কথা ভাবতেই পাপড়ির মুখে হাসি ফুটে ওঠে।পাপড়ি চট করে ফ্লোর ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।গুটি গুটি পায়ে ঢোকে নিজের রুমে । বিছানার কোণে পড়ে থাকা  ফোন টা তুলে নেয়।  ডায়াল করে মাই লাভ নামে সেভ করা নাম্বারে। আত্মার সমস্ত কাঁপন মিশে থাকে তার আঙ্গুলের ভাঁজে ভাঁজে। 


প্রথমবার রিং হয়, কিন্তু ফোন রিসিভ হয় না। 

পাপড়ি দ্বিতীয় বার কল করে।চট করেই কল রিসিভ হয়।ওপর প্রান্ত থেকে পুরুষালি কণ্ঠে ভেসে আসে,


“ সরি পাখি।ওয়াশরুমে ছিলাম।”


পাপড়ি নাক টেনে বলে,


“বলছি তোমার কি একটু সময় হবে? তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল।”


“ তোমার জন্য আমার জানটাও দিয়ে দিতে পারি পাখি।”


“ আমি লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি।তুমি যথা সময়ে চলে এসো।”


“ জো হুকুম মহারাণী।”


“ লাভ ইউ।”


“ লাভ ইউ টু ব‌উপাখি ।”


“ শোন আমি……


 বাক্য ফুরায় না পাপড়ির।অপর প্রান্ত থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।পাপড়ি বিছানায় ফোন ছুঁ*ড়ে মা*রে।কাবার্ড থেকে একটা  পার্পেল কালারের শাড়ি  বের করে গায়ে জড়িয়ে নেয়।চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে ভুলে না।পাপড়ি এমনিতেই নজরকাড়া সুন্দরী। হালকা সাজে তার সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে শতগুণে।পাপড়ির বিশ্বাস ছিল নীরব তাকে কোন অবস্থাতেই ছেড়ে যাবে না। কিন্তু পাপড়ির বিশ্বাসে জল ঢালে নীরব।


সবটা জানার পর নীরব ক্রোধে ফে*টে পড়ে। নিজের হাতের মুঠোয় পুরে রাখা পাপড়ির হাত দুটো ছেড়ে দেয়। উঁচু আওয়াজে বলে,


“ আর ইউ ক্রেজি পাপড়ি? তুমি এতো বড় একটা ভুল কী করে করলে? আর পরাগ’ই বা কেমন পুরুষ? নিজেকে একটু কন্ট্রোল করতে পারেনি?”


পাপড়ি  চোখ নামিয়ে নেয়। নত স্বরে বলে,


“ পরাগ ভাইয়ের কোন দোষ নেই নীরব। সেদিন পরাগ ভাই আমার মাথায় শুধু জলপট্টি দিচ্ছিল।

তার স্পর্শে কী ছিল আমি জানিনা।আমার ভেতর দোল খেয়ে উঠেছিল এক অজানা স্রোত। ।আমিই তাকে টেনে ছিলাম।আমি  নিজেই পরাগ ভাই কে সিডিউস করেছি।”


“ তোমার ছোট্ট একটা ভুল তোমার আমার মাঝে এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছে ।তুমি দেয়াল টাকে সরিয়ে দাও পাখি।আবার আগের মত হয়ে যাক সবকিছু।”


 বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় পাপড়ির।

কণ্ঠে একরাশ সংশয় নিয়ে বলে,


“ মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?”


“ এব*রশন করিয়ে নাও।সবে মাত্র কটা দিন হয়েছে।আই থিংক এখন এব*রশন করাতে খুব বেশি ঝামেলা হবে না।”


পাপড়ির হৃদয় হিম হয়ে যায়। চোখের পলকে যেন সময় থেমে দাঁড়ায়।কাঁপা কণ্ঠে বলে,


“ আমি এ*বরশন করাতে পারবো না নীরব।”


“ সরি পাপড়ি!আই হ্যাভ নাথিং টু ডু।”


“ হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট?”


“আমি তোমার সম্পর্কে সবটা জানার পরেও আমাদের রিলেশন কন্টিনিউ করেছিলাম। তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।কিন্তু এখন তুমি অন্যকারো সন্তান বয়ে বেড়াচ্ছো, এটা জানার পর আমি আর এই সম্পর্ক টা কন্টিনিউ করতে পারছি না।অন্য কারো বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়ানোর দায় পড়ে নি আমার।তোমার আমার সম্পর্ক এখানেই শেষ।আশা করি তুমি আর আমাকে ডিস্টার্ব করবে না ।”


 পাপড়ি টু শব্দটি না করে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে নীরবের চোখের সামনে থেকে।


পরাগ  পাপড়ির  চাচাতো ভাই। পাশাপাশি ফ্ল্যাট তাদের।পাপড়ি নিজের ফ্ল্যাটে না গিয়ে পৌঁছে যায় পরাগের ফ্ল্যাটে। বিধ্বস্ত পাপড়ি কে দেখে এগিয়ে আসে পরাগের বোন পুষ্প। সে ভ্রু কুঁচকায়,উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে ,


“ তোমাকে  এমন বিধ্বস্ত লাগছে কেন আপু? কী হয়েছে তোমার?”


পাপড়ি কাঁপা কণ্ঠে বলে,


“ পরাগ ভাই কোথায় পুষ্প?”


“ ভাইয়া তো বাসায় নেই। অফিসে গিয়েছে। জরুরী ক্লায়েন্ট মিটিং আছে আজ। অনেক বড় ডিল সাইন হবে। তুমি বোস।আমি তোমার জন্য ঠাণ্ডা শরবত করে আনছি।”


পাপড়ির ঠোঁটে ফেটে ওঠে তিক্ত স্মৃতি,


“ তোর ভাই আমাকে যে শরবত খাইয়েছে..শব্দ আঁটকে যায় পাপড়ির ঠোঁটের কোণে।পুষ্প প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,


“ পা*গলের মতো কী বিরবির করছো আপু?”


“ কিছু না।আমি আসছি বলেই পাপড়ি বেরিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য পরাগের অফিসে যাওয়ার।”


পাপড়ি পরাগের কেবিনে ঢুকতে গেলে বাধা দেয় 

সিকিউরিটি। বলে, এখন স্যারের সাথে দেখা করা যাবে না।ভেতরে স্যার ব্যস্ত আছেন।আমাকে বলে দিয়েছেন আমি যেন কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দিই।


 পাপড়ির  চোখে ক্রোধের আ*গুন জ্বলে ওঠে। সে তেজি কণ্ঠে বলে,


“আপনি জানেন আমি কে? না জানলে পরাগ ভাইয়ের থেকে জেনে নিবেন পাপড়ি ইশতেহাম ইলাহী কে?”         


“ আমি জানি আপনি কে ?কী আপনার পরিচয় ?তবুও  পারমিশন ছাড়া আমি আপনাকে স্যারের কেবিনে ঢুকতে দিতে পারি না।"


সিকিউরিটির কথা শুনেও থামল না পাপড়ি। জোর করে ঢুকে যায় পরাগের কেবিনে। কেবিনে ঢুকতেই‌‌ মনে হয় যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে তার।চোখের সামনে এ কী দেখছে সে?


চলবে ইনশাআল্লাহ.......... 


চলো_হারাই_নতুন_ভোরে (০১)

সুমি আক্তার

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url





sr7themes.eu.org