অচেনা ভোর 🌤️
অধ্যায় ২ : অচেনা ভোর 🌤️
সুমি আক্তার
ভোরের আলোয় ভিজে উঠেছিল ছোট্ট স্টেশন শহরটা।
ট্রেনের ধোঁয়া মিলিয়ে গেছে, গলির কোণে চায়ের দোকান খোলার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মৃত্তিকা একা নয় আর—তার পাশে বসে আছে আদর।
রাতে যা ঘটেছিল, সে নিয়ে কেউ কিছু বলে না।
শুধু নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতরে অদ্ভুত এক বন্ধন।
মৃত্তিকার চোখ লাল, তবে বুকটা হালকা।
সে গভীরভাবে নিঃশ্বাস ফেলে বলে—
“আমি এখন কোথায় যাবো জানি না।”
আদর তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সে নিজেও জীবনের দিক হারানো ছেলে।
মা-বাবা নেই, ঘর নেই, শহরের কলেজে ভর্তি হয়েছিল একসময়, কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে ভেসে গেছে দিনমজুরির অস্থিরতায়।
“দিদি, আমারও কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই,”—
আদরের গলায় ছিল নীরব স্বীকারোক্তি।
“চলো, একসাথে থাকি… অন্তত যতদিন না পর্যন্ত তুমি শক্ত হও।”
মৃত্তিকা চমকে তাকায়।
এক অচেনা ছেলে, যার হাতের স্পর্শ এখনো বুকের ভেতরে কাঁপন তুলছে—
সে-ই এখন আশ্রয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে।
তবু মৃত্তিকা অস্বীকার করতে পারে না।
কারণ তার কাছে হারাবার আর কিছু নেই।
তারা দু’জনে উঠল এক পুরনো ভাড়া ঘরে—
রেললাইনের ধারে, খোলা জানালা দিয়ে বাতাস ঢোকে, আর রাতে দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসে।
প্রথম ক’টা দিন মৃত্তিকা কেবল ঘুমিয়েই কাটায়।
ক্লান্ত দেহ, শূন্য বুক, আর ভাঙা মনের ওজন তাকে নিস্তেজ করে রেখেছিল।
আদর রান্না করে, পানি আনে, দরজা সামলে রাখে।
কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলে—
“দিদি অসুস্থ। চিকিৎসা চলছে।”
রাতের পর রাত মৃত্তিকা ঘুমের ঘোরে হঠাৎ ফিসফিস করে ওঠে—
“আমার ছেলেটা… আমার সোনা… কোথায় গেল?”
আদর কাছে গিয়ে বসে, তার কাঁধে হাত রাখে।
সে জানে, এই কান্নার কোনো উত্তর নেই।
তবু সেই কান্নার পাশে বসে থাকা—
এটাই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
কিন্তু পৃথিবী তো নীরব থাকে না।
গলির মহিলারা চোখ কুঁচকে তাকাতে শুরু করে।
কে এই বিধবা মেয়েমানুষ?
কোন ছেলে এভাবে তার সাথে থাকে?
তাদের ফিসফিসানি যেন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
একদিন পানিওয়ালা লোকটা এসে হেসে বলে—
“আদরদা, দিদিকে নিয়ে বেশ আছেন তো?
বউ না বোন?”
আদরের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
সে উত্তর দেয় না।
কিন্তু মৃত্তিকার বুকের ভেতর আবার জমে ওঠে অপরাধবোধের ঢেউ।
সেদিন রাতে সে হঠাৎ বলে ওঠে—
“তুমি চলে যাও, আদর।
আমার জন্য তোমার জীবনে কলঙ্ক জুড়বে।
লোকেরা ভালো চোখে দেখবে না।”
আদর ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলে—
“লোকেদের চোখে বাঁচার জন্য আমি জন্মাইনি, দিদি।
তুমি আছো বলেই আমি বেঁচে আছি।”
মৃত্তিকা কোনো উত্তর দিতে পারে না।
চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়ে।
রাতের শেষে আবার সেই বুকের ব্যথা ফিরে আসে।
দুধ জমে ফুলে ওঠে, শরীর কষ্টে কেঁপে ওঠে।
মৃত্তিকা কাঁপা গলায় বলে—
“আদর… ব্যথা করছে।”
আদর নীরবে তার পাশে বসে।
শব্দ করে না, প্রশ্ন করে না—
শুধু নিজের দায়িত্ব জানে।
সেই রাত আবার বয়ে নিয়ে আসে এক পবিত্র মুক্তি।
তাদের শরীর স্পর্শ করলেও, সম্পর্ক মিশে থাকে অন্য জায়গায়—
মায়া আর শূন্যতার মাঝে বাঁধা এক রহস্যময় বন্ধনে।
ভোর হলে মৃত্তিকা জানালার ধারে বসে রোদ দেখছিল।
মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর এক সিদ্ধান্ত।
সে মনে মনে বলল—
“হয়তো ভাগ্য আমায় ধ্বংস করেছে,
কিন্তু এই ছেলেটা… আমার ধ্বংসের ভেতর থেকে আশ্রয় খুঁজে দিল।”
আর বাইরে, শহরের শব্দ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকল—
যেন নতুন গল্পের জন্য পৃথিবী প্রস্তুত হচ্ছে।
